বাঙালি জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের এক ঐতিহাসিক দিন ৭ই মার্চ। ১লা
মার্চ (সোমবার) প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান দুপুর ১.০৫ মি. বেতার ভাষণে ৩ মার্চ
ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন।
১ লা মার্চ বিকেলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘হোটেল পূর্বাণী’তে এক সাংবাদিক
সম্মেলনে অধিবেশন স্থগিত ঘোষণার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ২ মার্চ মঙ্গলবার ঢাকা
শহরে হরতাল এবং ৩ মার্চ বুধবার সারা প্রদেশে হরতালের কর্মসূচির মাধ্যমে
অহসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেয়। তিনি ৭ মার্চ (রবিবার) রেসকোর্সে জনসভা
অনুষ্ঠানের কথা ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, ‘৭ মার্চের জনসভায় পরবর্তী কর্মসূচির
রূপরেখা দেওয়া হবে। নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে অসহযোগ আন্দোলন
চালিয়ে যেতে হবে।’
১ মার্চ থেকে মিছিলে মিছিলে ঢাকা শহর থেকে শুরু করে দেশের প্রায় প্রতিটি শহর
মুখরিত হয়ে উঠে। হরতালের ফলে সকল সরকারি কর্মকান্ড অচল হয়ে পরে। সারা
বিশ্বের সাথে যোগাযোগ বিছিন্ন হয়ে পরে। ৫ মার্চ পরিস্থিতি পাকিস্তানি সাময়িক
বাহিনীর নিয়ন্ত্রনের বাহিরে চলে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনণ আনতে পূর্ব
পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর লে. জে. সাহেবজাদা ইয়াকুব খান ঢাকায় আর সৈন্য না
পাঠিয়ে ইয়াহিয়াকে ঢাকায় এসে আলোচনার ব্যবস্থা করতে অনুরোধ জানান।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং জনগণকে ধোকা দেওয়ার জন্য ইয়াহিয়া খান ৬
মার্চ জাতির উদ্দেশ্যে এক বেতার ভাষণ দেয়। ভাষণে ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের
অধিবেশন আহবান করেন।
১-৬ মার্চ পর্যন্ত ছাত্র-জনতার কর্মকান্ড দেখে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পূর্ব পাকিস্তান
সামরিক সদর দপ্তর থেকে বিভিন্ন ভাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের নেতা
কর্মীকে এই মেসেজ দেয়, ‘৭ মার্চ যেন কোন ভাবেই জনগণকে উস্কানী না দেওয়া হয়
এবং স্বাধীনতা ঘোষণা না করা হয়।’
পূর্ব পাকিস্তানের জিওসি ৭ মার্চের জনসভার প্রাক্কালে আওয়ামী লীগের নেতাদের
স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ‘পাকিস্তানের সংহতির বিরুদ্ধে কোনো কথা বলা হলে তা শক্তভাবে
মোকাবেলা করা হবে। বিশ্বাস ঘাতকদের (বাঙালি) হত্যার জন্য ট্যাংক, কামান,
মেশিনগান সবই প্রস্তুত রাখা হবে। প্রয়োজন হলে ঢাকাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া
হবে। শাসন করার জন্য কেউ থাকবে না কিংবা শাসিত হওয়ার জন্যও কিছু থাকবে না।’ ৭
মার্চ জনসভাকে কেন্দ্র করে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রসহ রেসকোর্স ময়দানে কামান
বসানো হয়।
৭ মার্চ গভীর রাতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী একটি প্রেসনোটে ১৭২ জন নিহত
ও ৩৫৮ জন আহত হয়েছে বলে জানান।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুখ থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনের ডাক শুনতে
ছাত্র-জনতা ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান)
একত্রিত হতে থাকে। ৭ মার্চ ঢাকার সকল রাস্তা রেসকোর্স ময়দানে গিয়ে মিশে।
দুপুর থেকেই জনস্রোত আর স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠে রেসকোর্স ময়দান।
লক্ষ লক্ষ কণ্ঠে একই আওয়াজ স্বাধীনতার বজ্র শপথ। শ্লোগানের সাথে সাথে
উত্থিলিত হচ্ছে বাঙালির সংগ্রামের প্রতীক বাশের লাঠি, বাতাসে উড়ছে অসংখ্য
পতাকা।
৭ই মার্চে বাঙালির মুখে শ্লোগান ছিল, ‘তোমার দেশ আমার দেশ, বাংলাদেশ;
তোমার আমার ঠিকানা-পদ্মা, মেঘনা, যমুনা; তোমার নেতা আমার নেতা, শেখ মুজিব
শেখ মুজিব; বীর বাঙ্গালী অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো; ভুট্টোর মুখে
লাথি মারো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো; হুলিয়ার ঘোষণা, মানিনা মানিনা; মুক্তি যদি
পেতে চাও, বাংলাদেশ স্বাধীন কর; জাগো জাগো বাঙালি জাগো; পাঞ্জাব না বাংলা,
বাংলা বাংলা; পিন্ডি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা; জয় বাংলা।’
বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন তাঁর ভাষণ প্রচার না করা হলে কেউ রেডিও, টিভি স্টেশনে
যাবেন না। ভাষণ সরাসরি ঢাকা বেতারে সম্প্রচারের নির্দিষ্ট ঘোষণা থাকলেও
ধারাভাষ্যকারের উদ্দীপনাপূলক প্রচারে একদল সৈন্য আয়োজন ব্যর্থ করে দেয়।
বিক্ষুব্ধ বেতার কর্মীরা শাহবাগ রেডিও স্টেশন থেকে বেরিয়ে এসে রেসকোর্সে জনতার
কাতারে সামিল হয়। রেডিওতে ভাষণ প্রচারিত হয় পরের দিন।
০৩:২০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান পুরনো মডেলের টয়োটা গাড়িতে করে
সভামঞ্চে এসে উপস্থিত হন। ভারি ফ্রেমের চশমা খুলে রেখে তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ
শুরু করেন,
‘ভাইয়েরা আমার; আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি।
আপনারা সবই জানেন এবং বুঝেন। আমরা আমাদের জীবন দিয়ে চেষ্টা করেছি। কিন্তু
দুঃখের বিষয়, আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুরে আমার ভাইয়ের রক্তে
রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে।
আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার
চায়। কি অন্যায় করেছিলাম, নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ সম্পূর্ণভাবে আমাকে
আওয়ামী লীগকে ভোট দেন। আমাদের ন্যাশনাল এসেম্বলী বসবে, আমরা সেখানে
শাসনতন্ত্র তৈয়ার করবো এবং এই দেশকে আমরা গড়ে তুলবো, এদেশের মানুষ
অর্র্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজ
দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, তেইশ বৎসরের করুণ ইতিহাস বাংলার অত্যাচারের, বাংলার
মানুষের রক্তের ইতিহাস। তেইশ বৎসরের ইতিহাস মুমূর্ষু নরনারীর আর্তনাদের
ইতিহাস; বাঙলার ইতিহাস এদেশের মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার
ইতিহাস। ১৯৫২ সালে রক্ত দিয়েছি। ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করেও আমরা
গদিতে বসতে পারি নাই। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান মার্শাল ল’জারি করে দশ বৎসর
পর্যন্ত আমাদের গোলাম করে রেখেছে। ১৯৬৬ সালে ছয় দফা আন্দোলনে ৭ই জুনে
আমার ছেলেদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ১৯৬৯-এর আন্দোলনে আইয়ুব খানের
পতন হওয়ার পর যখন ইয়াহিয়া খান সাহেব সরকার নিলেন, তিনি বললেন, দেশে
শাসনতন্ত্র দেবেন, গণতন্ত্র দেবেন। আমরা মেনে নিলাম।
তারপরে অনেক ইতিহাস হয়ে গেল, নির্বাচন হলো। আমি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান
সাহেবের সঙ্গে দেখা করেছি। আমি, শুধু বাংলার নয়, পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির
নেতা হিসাবে তাকে অনুরোধ করলাম, ১৫ই ফেব্রুয়ারি তারিখে আপনি জাতীয় পরিষদের
অধিবেশন দেন। তিনি আমার কথা রাখলেন না, তিনি রাখলেন ভুট্টো সাহেবের কথা। তিনি
বললেন, প্রথম সপ্তাহে মার্চ মাসে হবে। আমরা বললাম, ঠিক আছে, আমরা
এসেম্বলীতে বসবো। আমি বললাম, এসেম্বলীর মধ্যে আলোচনা করবো; এমনকি আমি
এ পর্যন্ত বললাম, যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও, একজনও
যদি সে হয়, তার ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেব।
জনাব ভুট্টো সাহেব এখানে এসেছিলেন, আলোচনা করলেন। বলে গেলেন যে, আলোচনার
দরজা বন্ধ না, আরও আলোচনা হবে। তারপর অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলাপ
করলাম, আপনারা আসুন বসুন, আমরা আলাপ করে শাসনতন্ত্র তৈয়ার করি। তিনি
বললেন, পশ্চিম পাকিস্তানের মেম্বাররা যদি এখানে আসেন, তাহলে কসাইখানা হবে
এসেম্বলী। তিনি বললেন, যে যাবে তাকে মেরে ফেলে দেওয়া হবে। যদি কেউ এসেম্বলীতে
আসে তাহলে পেশোয়ার থেকে করাচী পর্যন্ত দোকান জোর করে বন্ধ করা হবে। আমি
বললাম, এসেম্বলী চলবে। তারপর হঠাৎ ১ তারিখে এসেম্বলী বন্ধ করে দেওয়া হলো।
ইয়াহিয়া খান সাহেব প্রেসিডেন্ট হিসাবে এসেম্বলী ডেকেছিলেন। আমি বললাম যে, আমি
যাবো। ভুট্টো সাহেব বললেন, তিনি যাবেন না। ৩৫ জন সদস্য পশ্চিম পাকিস্তান থেকে
এখানে আসলেন। তারপরে হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হলো। দোষ দেওয়া হলো বাংলার
মানুষকে, দোষ দেওয়া হলো আমাকে। বন্দুকের মুখে মানুষ প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠল।
আমি বললাম, শান্তিপূর্ণভাবে আপনারা হরতাল পালন করেন। আমি বললাম, আপনারা
কলকারখানা সব কিছু বন্ধ করে দেন। জনগণ সাড়া দিল। আপন ইচ্ছায় জনগণ রাস্তায়
বেরিয়ে পড়ল। তারা শান্তিপূর্ণভাবে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ
হলো।
কি পেলাম আমরা? যে আমার পয়াসা দিয়ে অস্ত্র কিনেছি বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে
দেশকে রক্ষা করার জন্য, আজ সেই অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে আমার দেশের গরীব-দুঃখী
আর্ত মানুষের বিরুদ্ধে, তার বুকের উপর হচ্ছে গুলী। আমরা পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু।
আমরা বাঙালিরা যখনই ক্ষমতায় যাবার চেষ্টা করেছি, তখনই তারা আমাদের উপর
ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। টেলিফোনে আমার সঙ্গে তার কথা হয়। তাকে আমি বলেছিলাম, জনাব
ইয়াহিয়া খান সাহেব, আপনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট, দেখে যান কিভাবে আমার
গরীবের উপরে, আমার বাংলার মানুষের উপরে গুলী করা হয়েছে, কি করে আমার মায়ের
কোল খালি করা হয়েছে। আপনি আসুন, দেখুন, বিচার করুন। তিনি বললেন, আমি
সিদ্ধান্ত নিয়েছি ১০ই তারিখে রাউন্ড টেবিল কনফারেন্স ডাকব।
আমি বলেছি, কিসের বৈঠক বসবে, কার সঙ্গে বসবো? যারা আমার মানুষের বুকের রক্ত
নিয়েছে তাদের সঙ্গে বসবো? হঠাৎ আমার সঙ্গে পরামর্শ না করে পাঁচ ঘণ্টা গোপনে
বৈঠক করে যে বক্তৃতা তিনি করেছেন, সমস্ত দোষ তিনি আমার উপরে দিয়েছেন,
বাংলার মানুষের উপর দিয়েছেন।
ভাইয়েরা আমার,
২৫ তারিখে এসেম্বলী কল করেছে। রক্তের দাগ শুকায় নাই। আমি ১০ তারিখে বলে
দিয়েছি যে, ওই শহীদের রক্তের উপর পা দিয়ে কিছুতেই মুজিবুর রহমান যোগদান করতে
পারে না। এসেম্বলী কল করেছে।
আমার দাবি মানতে হবে: প্রথম, সামরিক আইন মার্শাল ল’উইথ্ড্র করতে হবে;
সমস্ত সামরিক বাহিনীর লোকদের ব্যারাকে ফেরত নিতে হবে;
যেভাবে হত্যা করা হয়েছে তার তদন্ত করতে হবে;
আর জনগণের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।
তারপর বিবেচনা করে দেখবো, আমরা এসেম্বলীতে বসতে পারবো কি পারবো না। এর
পূর্বে এসেম্বলীতে বসতে আমরা পারি না।
আমি, আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না। আমরা এদেশের মানুষের অধিকার চাই। আমি
পরিষ্কার অক্ষরে বলে দিবার চাই যে, আজ থেকে এই বাংলাদেশে কোর্ট-কাচারি,
আদালত-ফৌজদারি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে। গরীবের
যাতে কষ্ট না হয়, যাতে আমার মানুষ কষ্ট না করে, সে জন্য সমস্ত অন্যান্য
জিনিসগুলো আছে সেগুলির হরতাল কাল থেকে চলবে না। রিকশা, গরুর গাড়ি চলবে, রেল
চলবে, লঞ্চ চলবে; শুধু সেক্রেটারিয়েট, সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট, জজকোর্ট,
সেমিগভর্ণমেণ্ট দপ্তরগুলো, ওয়াপদা কোন কিছু চলবে না।
২৮ তারিখে কর্মচারীরা বেতন নিয়ে আসবেন। এর পরে যদি বেতন দেওয়া না হয়, আর
যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোকদের হত্যা করা হয়, তোমাদের কাছে আমার
অনুরোধ রইল,
প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর
মোকাবেলা করতে হবে, এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সব কিছু, আমি যদি
হুকুম দিবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে মারবো, আমরা পানিতে
মারবো। তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাকো, কেউ তোমাদের কিছু বলবে না।
কিন্তু আর আমার বুকের উপর গুলী চালাবার চেষ্টা করো না। সাত কোটি মানুষকে
দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দমাতে পারবে
না।
আর যে সমস্ত লোক শহীদ হয়েছে, আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, আমরা আওয়ামী লীগের থেকে
যদ্দুর পারি তাদের সাহায্য করতে চেষ্টা করবো। যারা পারেন আমার রিলিফ কমিটিতে
সামান্য টাকা পয়সা পৌঁছিয়ে দেবেন। আর এই সাতদিন হরতালে যে সমস্ত শ্রমিক
ভাইরা যোগদান করেছেন, প্রত্যেকটা শিল্পের মালিক তাদের বেতন পৌঁছায়ে দেবেন।
সরকারি কর্মচারীদের বলি, আমি যা বলি তা মানতে হবে। যে পর্যন্ত আমার এই দেশের
মুক্তি না হবে খাজনা-ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়া হলো, কেউ দেবে না। মনে রাখবেন,
শত্রুবাহিনী ঢুকেছে, নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে, লুটপাট করবে। এই
বাংলায় হিন্দু মুসলমান বাঙালি অবাঙালি যারা আছে তারা আমাদের ভাই। তাদের রক্ষার
দায়িত্ব আপনাদের উপরে। আমাদের যেন বদনাম না হয়। মনে রাখবেন রেডিও
টেলিভিশনের কর্মচারীরা, যদি রেডিওতে আমাদের কথা না শোনেন, তাহলে কোন বাঙালি
রেডিও স্টেশনে যাবেন না। যদি টেলিভিশন আমাদের নিউজ না দেয়, কোন বাঙালি
টেলিভিশনে যাবেন না। দুই ঘণ্টা ব্যাংক খোলা থাকবে যাতে মানুষ তাদের মায়নাপত্র
নিবার পারে। কিন্তু পূর্ববাংলা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে এক পয়সাও চালান হতে পারবে
না। টেলিফোন টেলিগ্রাম আমাদের এই পূর্ববাংলায় চলবে এবং বিদেশের সঙ্গে নিউজ
পাঠাতে চালাবেন। কিন্তু যদি এদেশের মানুষকে খতম করার চেষ্টা করা হয়, বাঙালিরা
বুঝে শুনে কাজ করবেন। প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে
সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল এবং তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্ত্তত থাকো।
মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দিব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো
ইনশাল্লাহ্।
এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।
জয় বাংলা। জয় বাংলা।’
৭ মার্চের ভাষণে যেমন একজন শহুরে নারী অনুপ্রাণিত হয়েছেন, তেমনি গ্রামের
নারীরাও অনুপ্রাণিত হয়েছেন। তাই, তারা মিছিল-জনসভায় গিয়েছেন নির্দ্বিধায়। ৭
মার্চের মিছিল ও জনসভায় নারীদের হাতে ছিল বাশের লাঠি। সেদিন নারীরা এসেছিলেন
লাঠি হাতে জঙ্গি রূপ ধারণ করে। দেখা যায় মেয়েদের ভিড়ে মনোয়ারা বিবি নাম্নী এক
নারী বাশের লাঠি ঠুকে নিজের রচিত গান গাইছেন, ‘মরি হায়রে হায়, দূঃখের সীমা নাই;
সোনার বাংলা শ্মশান হইল; পরাণ ফাইডা যায়।’
ন্যাপের কয়েকশত কর্মী ও ন্যাপ নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে ৭ মার্চ ঢাকার প্রাদেশিক
ন্যাপ কার্যালয়ে আবদুল হালিমের সভাপতিত্বে ঢাকা শহর ন্যাপের কর্মীসভা অনুষ্ঠিত
হয়। সভায় অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ বলেন, ‘জনগণকে ইস্পাত দৃঢ়শপথ গ্রহণ করে
ঐক্যবদ্ধ ভাবে এগিয়ে যেতে হবে। গ্রামে গ্রামে পাড়ায় পাড়ায় গণসংগ্রাম কমিটি গঠন
করে এই সংগ্রামকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত করতে হবে।’
বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণটি নিয়ে পৃথিবীর বহু সমাজবিজ্ঞানী, রাজনৈতিক
বিশ্লেষক ও গবেষক বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ করেছেন।
৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে ঢাকা কর্তব্যরত মার্কিন কূটনীতিক আর্চার কে ব্লাড মন্তব্য
করেছিলেন, 'Mujib's speech on Sunday March 7 was more notable for what
he did not say than for what he actually said'.
গ্রেট ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হীথ বলেছেন, ‘পৃথিবীর ইতিহাসে
যতদিন পরাধীনতা থেকে মুক্তির জন্য সংগ্রাম থাকবে, ততদিন শেখ মুজিবুর রহমানের
৭ই মার্চের ভাষণটি মুক্তিকামী মানুষের মনে চির জাগরুক থাকবে। এ ভাষণ শুধু
বাংলাদেশের মানুষের জন্য নয়, সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস।’
পশ্চিমবঙ্গের প্রয়াত মূখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু বলেন, ‘৭ মার্চের ভাষণ একটি অনন্য
দলিল। এতে একদিকে আছে মুক্তির প্রেরণা। অন্যদিকে আছে স্বাধীনতার পরবর্তী
কর্ম পরিকল্পনা।’
ভারতীয় নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাঙালি
জাতির পথ প্রদর্শক। তাঁর সাবলীল চিন্তাধারার সঠিক মূল্য শুধু বাংলাদেশ নয়, সমস্ত
পৃথিবী স্বীকার করবে।’
কিউবার অবিসংবাদিত নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো বলেছেন, ‘৭ই মার্চের শেখ মুজিবুর
রহমানের ভাষণ শুধুমাত্র ভাষণ নয়, এটি একটি অনন্য রণকৌশলের দলিল।’
