বঙ্গবন্ধু ভাষণ সরাসরি ঢাকা বেতারে সম্প্রচারের নির্দিষ্ট ঘোষণা থাকলেও সামরিক
কর্তৃপক্ষ তা প্রচার বন্ধ করে দেয়। বেতার কর্মীদের ব্যাপক প্রতিবাদ ও চাপে
সামরিক জান্তা নতি স্বীকার করে। সকাল ৮ টা ৩০ মিনিটে দেশের সকল বেতারকেন্দ্র
থেকে ভাষণটি প্রচার করা হয়।
পূর্ব বাংলার জনগণের দিন শুরু হয় ৭ মার্চে রেসকোর্সে ময়দানে দেয়া বঙ্গবন্ধুর
ঐতিহাসিক ভাষণ শোনার মধ্য দিয়ে।
বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার পর আন্দোলনের রুপ নেয়। হাই কোর্টে বিচারপতি থেকে শুরু
করে পূর্ব বাংলার সকল জনগণ বঙ্গবন্ধুর একক নেতৃত্ব মানতে শুরু করে। সকলে
বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের নির্দেশে কাজ করার সংকল্প নেন।
পাকিস্তানের সামরিক কর্তৃপক্ষ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার পরে বুঝতে পেরে যায়,
‘বাঙালীকে এখন আর ধমিয়ে রাখা যাবে না।’ পরিস্থিতি সামরিক কতৃপক্ষের
নিয়ন্ত্রণে আনতে পাকিস্তানি সৈন্যরা ক্যান্টনমেন্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।
ঐদিকে ইয়াহিয়া খান ও রাও ফরমান আলী পূর্ব বাংলার জনগণের ওপর আক্রমণের
নকশা তৈরি করতে থাকে।
৭ মার্চ গভীর রাতে পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষ একটি প্রেসনোটে বলেন, ‘পূর্ব
পাকিস্তানে সাম্প্রতিক দূঃখজনক হাঙ্গামায় আইন ও শৃঙ্খলা রক্ষায় নিযুক্ত
বাহিনীর দ্বারা হাজার হাজার লোক নিহত হইয়াছে বলিয়া যে সাধারণ ধারণার সৃষ্টি
হইয়াছে উহা নিছক মিথ্যা। ফলে বাজে প্রোপাকান্ডা ছড়িয়া পড়িয়াছে।
তৎপরিপ্রেক্ষিতে প্রকৃত অবস্থা ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন হইয়া পরিয়াছে।
জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্বগিত রাখা সম্পক্ষিত প্রেসিডেন্টের ১লা মার্চ তারিখের
ঘোষণা প্রকাশিত হইবার পর জন সাধারণের মধ্যে ক্রত এবং শ্বতঃফুর্ত
প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। শেখ মুজিবুর রহমানের আহবানে ২রা মার্চ সকাল হইতে পূর্ণ
হরতাল পালন শুরু হয়।…
সম্ভাব্য ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম, লুঠতরাজ, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি হইতে রক্ষার
উদ্দেশ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান সমূহে সেনাবাহিনীর লোকজন নিয়োগ করা
ছাড়া সশস্ত্র বাহিনী ব্যারাকেই অবস্থান করিতেছিল। কিন্তু জিন্নাহ এভেনিউ,
নবাবপুর রোড, ঠাটারী বাজার এবং ঢাকা শহরের অন্যান্য এলাকায় ব্যাপক আকার
দাঙ্গা শুরু হইলে আইন ও শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বেসামরিক কর্তৃপক্ষ অক্ষম বলিয়া
প্রতীয়মান হওয়ার পর এবং তাহাদের সুনিদিষ্ট এবং বরাবর অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে
২ মার্চ সকাল থেকে সশস্ত্র বাহিনী লোকজন পবিস্থিতি নিয়ন্ত্রনের জন্য তলব করা
হয়।
সেই রাত্রেই সন্ধ্যা আইন জারি করা হয়। সন্ধা আইন রাত ৯টা থেকে সকাল ৭টা
পর্যন্ত বলবৎ থাকে। সৈন্যরা সন্ধ্যা আইনের পূর্বে ব্যারাক হতে বের হই নাই।’
প্রেসনোটে উল্লেখ করা হয় দাঙ্গা হাঙ্গামায় পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশে এই
কয়েকদিনে ১৭২ জন নিহত ও ৩৫৮ জন আহত হয়েছে বলে মিথ্যা তথ্য দেয়।
প্রেসনোটে উল্লেখ করা হয় চট্টগ্রামে ৭৮ জন, খুলনায় ৪১ জন নিহত হয়েছে।
যেখানে ৫ মার্চ পর্যন্ত চট্টগ্রামে নিহতের সংখ্যা ছিল ২৩৮ জনের অধিক।
পাকিস্তানি সামরিক কতৃপক্ষের প্রেস নোটকে মিথ্যাচার বলে উল্লেখ করে এক
বিবৃতিতে প্রেস নোট বাতিল করে দেয়। তিনি অভিযোগ করেন, সামরিক বাহিনী নিরস্ত্র
বাঙালির অধিকার আদায়ের শান্তিপূর্ণ সংগ্রামে বিনা কারণে গুলি চালিয়েছে তাছাড়া
হতাহতের সংখ্যা ব্যাপক হারে কমিয়ে বলা হয়েছে। তিনি অবিলম্বে সামরিক বাহিনীকে
ব্যারাকে ফিরিয়ে নেবার দাবি জানান। তিনি বলেন, ‘বাঙ্গালীরা আজ পুরোপুরি ঐক্যবদ্ধ
এবং ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টির এ ধরনের চেষ্টা আর সফল হবে না। আমরা পুনরায় দাবী
করছি, সকল সৈন্যকে ছাউনীতে ফিরিয়ে নিতে হবে।’
পৃথক আরেকটি বিবৃতিতে তিনি ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধু প্রদত্ত ভাষণের কিছু বিষয়ের
ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, ‘ব্যাংক সমূহ সকাল ৯টা থেকে ২ টা পর্যন্ত খোলা থাকবে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নগদ জমা, বেতন ও মজুরী প্রদান, আন্তঃব্যাংক ক্লিয়ারেন্স
ও নগদ লেনদেন করার নির্দেশ দেয়া হয়। বিদ্যুৎ, সার, পানি, গ্যাস ও পাওয়ার
পাম্পের সরবরাহ চালু থাকবে। পোস্ট অফিস ও সেভিংস ব্যাংক সার্ভিস চালু থাকবে।’
৮ মার্চ ছাত্রলীগের সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী; সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সিরাজ
এবং ডাকসুর সভাপতি আ.স.ম. আবদুর রব; সাধারণ সম্পাদক আব্দুস মাখন এক যুক্ত
বিবৃতিতে বলেন, ‘বাংলার বর্তমান মুক্তি আন্দোলনকে ‘স্বাধীনতা আন্দোলন’ ঘোষণা
করে স্বাধীন বাংলার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চ রেসকোর্স
ময়দানের ঐতিহাসিক জনসভায় যে প্রত্যক্ষ কর্মসূচী ঘোষণা করেছেন আমরা তাঁর
প্রতি সম্পূর্ণ ঐক্যবদ্ধ ভাবে ঝাপিয়ে পড়ার জন্য বাংলার সংগ্রামী জনতার প্রতি
আহবান করছি।’
পরিস্থিতি খারাপ দেখে, ঢাকায় অবস্থানরত বিদেশী নাগরিকেরা ঢাকা ত্যাগ করতে শুরু
করেন। এই দিন কেবলমাত্র ব্রিটেন ও পশ্চিম জার্মানীরই ১৭৮ জন নাগরিক ঢাকা
ত্যাগ করেন। লন্ডনস্থ পাকিস্তান হাইকমিশনের সামনে ১০ হাজার প্রবাসী বাঙালির
অংশগ্রহণে স্বাধীন বাংলার দাবিতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হয়।
পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের পরিবর্তে শুধুমাত্র ছাত্রলীগ নাম ব্যবহারের জন্য পূর্ব
পাকিস্তান ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় সংসদের এক সভায় প্রস্তাব পেশ করা হয়। সকল
পর্যায়ের প্রাথমিক ইউনিট গুলোতে পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ
গঠন করার নির্দেশ প্রদান করা হয়।
ইয়াহিয়া খান ব্রিগেডিয়ার জিলানীর মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে লিখিত বার্তার মাধ্যমে
জানান, ‘আপনি যা দাবী করেছেন, তার চাইতে বেশি কিছু দিতেও আমার আপত্তি নেই।
আমি অচিরেই ঢাকা আসছি, তখনই বিস্তারিত আলাপ হবে।’
৮ মার্চ থেকে শুরু হয় নতুন আন্দোলন; স্বাধীকার আন্দোলন। বঙ্গবন্ধুর ভাষণে
অনুপ্রাণিত হয়ে বাঙ্গাল প্রতিটি প্রদেশে, প্রতিটি জেলা থেকে শুরু করে গ্রাম-বন্দরে
ছাত্র-জনতা একত্রিত হতে থাকে। মুক্তির সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হতে থাকে।
