জনগণকে ধোকা দেওয়ার জন্য ইয়াহিয়া খান ৬ মার্চ জাতির উদ্দেশ্যে এক বেতার
ভাষণ দেয়। ভাষণে ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহবান করেন। প্রকৃত পক্ষে
পশ্চিম পাকিস্তান থেকে প্রয়োজনীয় সৈন্য ও অস্ত্র আনার জন্য এই ঘোষণা দেয়।
কারণ- তার জন্য পূর্ব পাকিস্তানে আক্রমণের জন্য সময় প্রয়োজন ছিল।
ইয়াহিয়া খান এই দিনে জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানে গভর্নর নিযুক্ত
করেন। ইয়াহিয়া পূর্ব পাকিস্তানের এই পরিস্থিতির জন্য আওয়ামী লীগ ও শেখ
মুজিবকে দায়ী করে।’ তিনি তার বেতার ভাষণে বলেন, ‘আমি পরিস্কার বলে দিতে চাই
যে, পরে কি ঘটবে তাতে কিছু যায় আসে না। পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী যতদিন আমার
কমান্ডে আছে এবং যতদিন আমি রাষ্ট্রপ্রধান আছি ততদিন আমি পাকিস্তানের পূরণ
সংহতি বজায় রাখব। পাকিস্তান রক্ষা করার দায়িত্ব আমার কাছে আছে।’
ইতিপূর্বে জাতীয় পরিষদের অধিবেষন স্থগিত রাখার কারণ হিসেবে তিনি বলেন,
‘পরিবেশ শাসনতন্ত্র রচনার উপযোগী ছিল না। কারণ পশ্চিম পাকিস্তানের বিপুল
সংখ্যায় প্রতিনিধি ৩রা মার্চ তারিখে অধিবেশন যোগদান করিতে অসম্মতি জানান।’
আলোচনার অন্তরালে তিনি পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকে।
বেসাময়িক পোশাকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য আনতে থাকেন। তাছাড়া নগদ টাকা
সহ সিনিয়র আর্মি অফিসারদের পরিবার; বড় বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের মালিক ও
তাদের পরিবারকে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাচ্ছিল।
৬ মার্চ পরিস্তিতি এতোটাই খারাপ হয়ে যায় যে, জেলে থাকা কয়েদীদের মধ্যে
অসন্তোশ দেখা দেয়। ঢাকা সেন্ট্রাল জেল থেকে ৩৪১ জন কয়েদী পালিয়ে যায়। পরে ১৬
জন কয়েদি ধরা পরে। বেলা অনুমান সাড়ে ১১টার সময় এই ঘটনা ঘটে। কয়েদিরা জেলের
গেট ভেঙ্গে পালায়। পালানোর সময় নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে ৭ জন নিহত হয়। আহত
হয় অন্তত ৩০ জন।
বাংলার শিল্পী সমাজ গণহত্যার প্রতিবাদ করে বাংলার স্বাধীকার আন্দোলন
প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় নিয়ে শপথ করে বলেন, ‘মুক্তিকামী বাংলার মানুষের উপর
নির্যাতন ও ব্যাপক গণহত্যার প্রতিবাদে পূর্ব বাংলার শিল্পী সমাজ আজ বিক্ষুব্ধ;
বাহির করিবে। যন্ত্র শিল্পীরা তবলা ছাড়িয়া ধরিবে দামাম, অভিনেত্রীরা সংগ্রামের
সংলাপ উচ্চারণ করিবে আর চিত্রশিল্পী আঁকিবে ছবি।’
সন্ধা ৬টায় পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের একটি মশাল মিছিল বায়তুল মোকাররম থেকে
যাত্র শুরু করে ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন পথ অতিক্রম করে। মিছিলের সময়
ছাত্রলীগের কর্মীরা সর্বসাধারণকে স্বাধীনতার আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহবান
করেন। ‘পরিষদে লাথি মার, বাংলাদেশ মুক্ত কর; আপোষ প্রস্তাবে লাথি মার,
স্বাধীকার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পর; জাতির পিতা শেখ মুজিব, পরিষদে যাবে না’ বলে
স্লোগান দিতে থাকে।
এই দিন খুলনায় পূর্ণ হরতাল পালিত হয়। খালিশপুরের আওয়ামী লীগের উদ্যোগে এক
শ্রমিক জনতা মিছিল নিয়ে খুলনার প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে ফুলবাড়ি থেকে
দৌলতপুর আগ্রসর হওয়ার সময় ৫টি ট্রাক ও ৩২টি জিপ শান্তিপূর্ণ মিছিলের নিটক
দিয়ে গিয়ে দৌলতপুর ডাকঘরের সামনের সড়কের ব্যারিকেড সরাতে গেলে উত্তেজিত
জনতার সাথে সংঘর্ষ হয়। তখন পাকিস্তানি সেনারা গুলি বর্ষণ করে। এত ৫ জন নিহত
হয়।
৭ মার্চের ইত্তেফাক পত্রিকায় খুলনার ৬ মার্চের খুলনার দাঙ্গা সম্পর্কে বলা
হয়েছে, ‘খুলনার বিভিন্ন স্থানে গতকাল দাঙ্গা-হাঙ্গামা এবং গুলি বর্ষণে ৫০-৬০
জনেরও বেশি লোক নিহত হয়েছে।’
রাতে পাকিস্তানি সামরিক কতৃপক্ষ একপি প্রেসনোটে বলে, ‘গত ৩ ও ৪ মার্চ যশোর,
খুলনা ও রাজশাহী টেলিফোন এক্সচেঞ্জে এক উৎশৃঙ্খল জনতা আক্রমণ করলে সেনা
বাহিনীর গুলি করতে বাধ্য হয়। ফলে ৮ জন ব্যক্তি নিহত ও ১৮ জন আহত হয়।’
প্রায় চার লক্ষ জনতার একটি বিশাল গণবাহিনী ৬ মার্চ যশোর আক্রমণ করে।
পাকিস্তানি বাহিনী বীতি ছরিয়ে ছত্র ভঙ্গ হয়ে ক্যান্টনমেন্টে পালিয়ে যায়। বহু
পাকিস্তানি সৈন্য জনগণের হাতে ধরা পরে। বহু বিহারী লুটরাজ করতে গিয়ে জনগণের
হাতে ধরা পরে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানে কাছে বিভিন্ন স্থান থেকে খবর আসতে থাকে,
‘পাকিস্তানি সেনারা অবাঙালি এলাকাগুলোতে গোপরে অস্ত্র সরবরাহ করছে।’ এই দিনে
উত্তর কমলাপুরে শান্তি কমিটি গঠিত হয়। দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকা থেকে জানা যায়,
‘উত্তর কমলাপুর ৮নং ওয়ার্ডর জন সাধারণের সর্বমম্মকিক্রমে এম. এ. জলিলকে
সভাপতি এবং জামিল হোসাইনকে সম্পাদক করে ১৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি শান্তি কমিটি
গঠন করা হয়।’ এমন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন বাহিনীর বাঙালি সদ্যরা মুজিবকে জানান, ‘এ
ধরণনর কোন কর্মকান্ড হলে, তারা তাঁকে সহযোগিতা করবেন।’
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ইয়াহিয়া খানের ভাষণের পরে দলীয় হাইকমান্ড ও ছাত্রলীগের
সঙ্গে বৈঠক করেন। এই বৈঠকে আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে জাতীয় লীগ;
মোজাফফর আহমদের নেতৃত্বে ন্যাপ; অলি আহাদ; শ্রমিক নেতা কাজী জাফর আহমদ
পৃথক পৃথক ভাবে সমাবেশ করে আন্দোলন অব্যাহত রাখার আহবান করেন।
পরিস্থিতির চাপে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পূর্ব পাকিস্তান সামরিক সদর দপ্তর থেকে
বিভিন্ন ভাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীকে এই মেসেজ
দেয়, ‘৭ মার্চ যেন কোন ভাবেই জনগণকে উস্কানী না দেওয়া হয় এবং স্বাধীনতা
ঘোষণা না করা হয়।’ ৭ মার্চ জনসভাকে কেন্দ্র করে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রসহ
রেসকোর্স ময়দানে কামান বসানো হয়।


