একাত্তরের ৫ মার্চ আন্দোলন আরো তিব্র আকার ধারণ করে। এই দিন ঢাকা স্টেশন
থেকে কোন ট্রেন ছাড়েনি এমনকি কোন ট্রেন ঢাকায় আসেনি। লঞ্চ টার্নালের অবস্থা
একই ছিল। ঢাকার সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সরকারি বেসকারি অফিস, আদালত বন্ধ
থাকে। পরিস্থিতি পাকিস্তানি সাময়িক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলে যায়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনতে পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর লে. জে.
সাহেবজাদা ইয়াকুব খান ঢাকায় আর সৈন্য না পাঠিয়ে ইয়াহিয়াকে ঢাকায় এসে
আলোচনার ব্যবস্থা করতে অনুরোধ জানান। প্রথমত ইয়াহিয়া রাজি হলেও পরবর্তিতে
৫ মার্চ ঢাকায় আসতে অস্বীকৃতি জানান। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে লে. জে. সাহেবজাদা ইয়াকুব
খান দায়িত্ব থেকে ইস্তফা দিয়ে পদত্যাগপত্র পাঠান। তিনি পদত্যাগ বার্তা পাঠানোর
আগেই পাঞ্জাবের সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব
পাকিস্তানের গভর্নর পদে নিয়োগ দিয়ে দেয়। যেটি তিনি আঁচ করতে পারেন নি।
এই দিনে টঙ্গী শিল্প এলাকায় পাকিস্তানি সেনারা গুলিবর্ষণ করে। পাকিস্তানি
সশস্ত্র বাহিনী দফায় দফায় মোট ৬২ রাউন্ড গুলি করে। গুলিবর্ষণে চার জন শ্রমিক
নিহত ও ২৫ জন আহত হয়। গুলীতে নিহতের মধ্যে ছিলেন- আব্দুল মতিন (৩০), রফিজ
উদ্দিন (২৫), আব্দুল মিয়া (৩৫) সমগ্র টঙ্গী এলাকা বিক্ষোভে জ্বলে উঠে। বিক্ষপ্ত
জনগণ টঙ্গীর কংক্রিট ব্রীজের পাশের কাঠের ব্রিজটি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। বড়
বড় গাছ ফেলে রাস্তা বন্ধ করে রাখেন। খবরটি ঢাকায় ছড়িয়ে পরলে ঢাকায়
উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। ছাত্রলীগের উদ্যোগে ছাত্র-জনতার সমাবেশ থেকে টঙ্গী নিহত
শ্রমিকদের লাশ নিয়ে ঢাকায় মিছিল বের হয়।
ছাত্র ইউনিয়নের আয়োজিত কেন্দীয় শহীদ মিনারে মতিয়া চৌধুরী বলেন, ‘বাংলার
স্বাধিকার আন্দোলনের সংগ্রামে মুক্তিবাহিনী গঠন করতে হবে।’ ছাত্র ইউনিয়নের
সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘এই স্বাধীকাকারের সংগ্রাম
জনতার সংগ্রাম। এই সংগ্রামে আমাদের বিজয় সুনিশ্চিত। এখন দরকার তা হলো
দুর্বার গণ আন্দোলন আরও জোরদার করা।’
সামরিক অফিসার এয়ার মাশার্ল আসগর খান করাচী থেকে ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধু শেখ
মুজিবুর রহমানের সাথে দেখা করেন। তিনি ৪৫ মিনিট বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে
আলোচনা করেন। তিনি বঙ্গবন্ধু ভবিষ্যতে কী হতে পারে বা কী হতে যাচ্ছে জানতে
চাইলে বলেন, ‘ইয়াহিয়া ও ভুট্টোর নির্দেশে সামরিক অভিযান চালানো হবে, আমাকে
গ্রেফতার অথবা হত্যা করা হবে এবং পাকিস্তান ভেঙে যাবে।’
ঢাকার লেখক-বুদ্ধিজীবীরা মিছিল নিয়ে ড.আহমদ শরীফের নেতৃত্বে শহীদ মিনারে
উপস্থিত হন। তারা সেখানে স্বাধীনতার শপথ গ্রহণ করেন। অধ্যাপক মায়হারুল
ইসলাম তাঁর বক্তৃততায় বলেন, ‘আজ বক্তৃতা করিবার সময় নয়, পথে নামার সময়।
আমরাও বাংলাদেশের স্বাধীকারের আন্দোলনের সহিদ একাত্মতা ঘোষণা করিতেছি।’
সামরিক শাসক সৈন্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন।
সামরিক শাসক কর্তৃপক্ষ ঘোষণায় বলা হয়, ‘শেখ মুজিবুর রহমান শান্তির জন্য
আহবান জানানোর পর গত ২৪ ঘন্টায় দেশে সাধারণ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে
যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে।
এই কয়েক দিন পর্যন্ত পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ঢাকায় কয়েকশ, চট্টগ্রামে ২৩৮,
খুলনায় ৩৫ জন সহ সারা পূর্ব পাকিস্তানে কয়েকশত মানুষ শহিদ হন। আওয়ামী
লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দিন আহমদ এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ঢাকা চ্ট্গ্রাম,
রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, সিলেট এবং বাংলাদেশের অন্যান্য স্থানে মিলিটারীর বুলেটে
নিবীহ নিরস্ত্র মানুষ, শ্রমিক, কৃষক ও ছাত্রদের ধরাশায়ী করা হয়েছে। অবিলম্বে এই
নরহত্যা বন্ধ করিতে হইবে। যারা এই ঘটনার জন্য দায়ী তাদের জানা উচিত যে,
নির্বিচারে নিরীহ নিরস্ত্র মানুষকে এভাবে হত্যা করা মানবতা বিরোধী অপরাধ ছাড়া
আর কিছু না। তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষকে মৌলিক অধিকার হইতে বঞ্চিত
করা এবং বাংলাদেশকে পশ্চিম পাকিস্তানের কায়েমী স্বার্ধবাদী মহলকে বেসামরিক
অধিবাসীকে ভয়-ভীতি দেখানোর জন্য সামরিক বাহিনীর অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান হইতে হাজার হাজার হত্যা হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
আমরা সৈন্য বাহিনীর এই গৃহ্নিত আচরণের তীব্র নিন্দা করিতেছি।’
ঢাকার বাহিরে পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশ ও জেলার অবস্থা ঢাকার চাইতে
খারাপ হতে থাকে। বিভিন্ন শহরে ছাত্র-জনতা বিক্ষোভ মিছিল করে। যদিও ছাত্র-
জনতার শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ মিছিলে পাকিস্তানি সেনারা গুলিবর্ষণ করে।
ইতিমধ্যে চট্টগ্রামের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনের বাহিরে চলে যায়। চট্টগ্রামে নিহতের
সংখ্যা বেড়ে ২৩৮ জন দাঁড়ায় বলে রবিন্দ্রনাথ ত্রিবেদী তার একাত্তরের দশমাস
গ্রন্থে উল্লেখ করেন। দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় চট্টগ্রামে ১৩৮ জন নিহত হয়
বলে ৬ মার্চের পত্রিকায় উল্লেখ করেন। চট্টগ্রামে ১৩৮ জন নিহত শিরনামে বলা হয়,
‘গত ২৪ ঘন্টায় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আনীত আহত ব্যক্তিদের
মধ্যে আরও ১৪ জনের মৃত্যু ঘটেছে। এ পর্যন্ত সর্মোট নিহতের সংখ্যা ১৩৮ জনে
উন্নিত হয়েছে।’
এই দিনে খুলনার দৌলতপুরের ফুলবাড়ী ক্রসিংয়ের নিকট মিছিলরত জনতার উপর
পাকিস্তানি সৈন্যরা বেপোরা গুলীবর্ষণ করে। গুলিতে ৮ জন নিহত হয়। খুলনার
দৌলতপুর শিল্পল্প এলাকা সহ শহরের বেশ কয়েকটি স্থানে পাকিস্তানি সেনারা গুলি
বর্ষণ করে। ৫ মার্চ এই দিনে খুলনায় ১৮ জন শহিদ হয়। যার মধ্যে ১১ জনই ছিল
কাবুলীওয়ালা। আহত হয় প্রায় একশত জন।
৫ মার্চ স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম ফরিদপুরের অম্বিকা ময়দানে ছাত্র-জনতার
সভা অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ ছাত্রদের আর্দোলনের চূড়ান্ত লক্ষ্যে
এগিয়ে যেতে বলেন। এই দিন ফরিদপুরের প্রধান সড়ক জিন্নাহ এভিনিউর পরিবর্তে
শেখ মুজিব সড়ক; লিয়াকত আলী সগকের পরিবর্তে সূসেন সড়ক; কায়েদে আজম
লাইব্রেরির পরিবর্তে শেরেবাংলা পাঠাগার; আজম মার্কেটের পরিবর্তে তিতুমির
বাজর নামকরণের সিদ্ধন্ত গ্রহণ করেন। সমাবেশ শেষে ছাত্র-জনতা ডেপুটি কমিশনার
ও পুলিশ সুপারের অফিস ঘেরাও করেন। সেখান থেকে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে আগুন
ধড়িয়ে দেয়। পরে সেখানে বাংলাদেশের পতাকা উত্তলন করে। ছাত্র-জনতা ফরিদপুর
সার্কিট হাউসে প্রবেশের চেষ্টা করলে পাকিস্তানি সৈন্যরা তাদের বেয়নেট চার্জ করে।
এত বেশ কয়েকজন আহত হয়।
রাজশাহীতে পাকিস্তানি সেনারা মিছিলকারীদের উপরে গুলিবর্ষণ করে। গুলিতে একজন
নিহত ও ১৪ জন আহত হয়। পাকিস্তানি সেনারা এই দিনে রাজশাহী মেডিকেল কলেজের
হোস্টেলে প্রবেশ করে ছাত্রদের হোস্টেল ছাড়তে বলে। সেনারা একটি লিস্ট করে
ছাত্রদের গ্রাফতার করে। রুমে ঢুকে ছাত্রদের দড়ি দিয়ে বেঁধে নির্যাতন করে।
রাজশাহীর স্থানীয় ছাত্র নেতাদের বাড়ি আক্রমণ করে তল্লাশি চালায়।

