৪ মার্চ নাগাদ পূর্ব পাকিস্তানের সর্বত্র বেসামরিক শাসনব্যবস্থা পুরোপুরি
অকার্যকর হয়ে পড়ে। সরকারী-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত, ব্যবসা ও
শিল্প প্রতিষ্ঠান, বিমান-রেল-বাস-স্টিমার, ব্যাংক, স্টক এক্সচেঞ্জসহ সকল
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। এমন অবস্থায় ঢাকায় কারফিউ তুলে দেয়া হয়। তবে
ঢাকা বিমান বন্দরে সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকে।
এই দিন পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশের শহর, জেলা শহরে ছাত্র-জনতা জনসভা,
মিছিল সহ ২ ও ৩ মার্চ পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর হাতে শহিদের উদ্দেশ্য
গায়েবানা জানাজা পালন করেন।
এই দিন মাওলানা হামিদ খান ভাসানী এক বিবৃতিতে লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে, ‘সাত
কোটি বাঙালির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব’এর দাবী জানান। তখন তিনি বলেন, ‘আমার
রক্তের বিনিময়ে হলেও সার্বভৌমত্ব ছিনিয়ে আনব।’ গত দু’দিনে ঢাকায় ১২১ জন,
চট্রগ্রামে ১২১ জন, খুলনায় ৭ জন (যদিও বিভিন্ন স্থানে ৬ জনের কথা উল্লেখ
রয়েছে) সহ সারা পূর্ব বাংলায় সংখ্যা কয়েকশত মানুষ শহিদ হয়। এই গণহত্যার নিন্দা
জানিয়ে মাওলানা ভাসানী বলেন, ‘পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই সামরিক ও বেসামরিক
সরকারগুলো বাংলার নিরীহ মানুষকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করেছে। নির্যাতন ও
গণহত্যা করেছে।’ এবারের পরিণাম ভয়াবহ হবে বলে তিনি পাকিস্তানি সামরিক
শাসকদের হুঁশিয়ারী দেন। তিনি শাসকদের সাম্রাজ্যবাদীদের দালাল হিসেবে আখ্যা দিয়ে
বলেন, ‘পাকিস্তানিদের নির্যাতণের ৮৫% বাঙালি ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর মুখোমুখি এসে
পৌঁছেছে। সুতরাং হত্যাকারীদের সঙ্গে যারাই আতাঁত করবে বা করতে যাবে তাদের
জানমাল বিপন্ন হবে।’
তিনি কংগ্রেস, খেলাফত, মুসলিম লীগ, আওয়ামীলীগ ও ন্যাপের মাধ্যমে আন্দোলন
করেছেন কিন্তু তাঁর ৮৯ বছরের জীবনে এবারকার মত গণজাগরণ ও অগণতান্ত্রিক
ঘোষণার বিরুদ্ধে এতটা সংঘবদ্ধ বিক্ষোভ আর দেখেননি বলে তিনি জানান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসমিতি ও ৫৫ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ‘পাকিস্তান
অবজারভার’ এর গণবিরোধী ভূমিকার তীব্র নিন্দা করেন। এডমিরাল আহসান পশ্চিম
পাকিস্তানে রওয়ানা হয়ে যান। টেলিফোনে লে. জে. টিক্কা খানকে পূর্বাঞ্চলের গভর্নর
নিয়োগ করা হচ্ছে; সংবাদ পেয়ে লে. জে. সাহেবজাদা ইয়াকুব খান পদত্যাগ করতে চান।
রাত ১১টায় বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে রাও ফরমান আলী কিছু প্রস্তাব নিয়ে যান।
প্রত্যুত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘পাকিস্তান বাঁচতে পারে, সেজন্য চিন্তাভাবনা করার
মতো মানসিক অবস্থা থাকতে হবে। দেখুন, আমার লোকেরা পথে ঘাটে বেঘোরে মারা
যাচ্ছে।’ তখন রাও ফরমান আলী বঙ্গবন্ধুকে বলেন, ‘সেনাবাহিনীর সাথে সংঘাতে লিপ্ত
হওয়া খুব ভাল হবে কি?’
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৪ঠা মার্চ এক বিবৃতিতে উপনিবেশবাদী শোষণের
বিরুদ্ধে জনগণকে রুখে দাঁড়িতে বলেন। তিনি বলেন, ‘চরম ত্যাগ স্বীকার করা ছাড়া
কোনদিন কোনো জাতির মুক্তি আসে নি। বাংলাদেশের নিরস্ত্র বেসামরিক জনগণ যথা-
কৃষক, শ্রমিক ও ছাত্ররা তাদের অধিকার কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে যে সাহস দৃঢ় সংকল্প
নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন, বিশ্বের জনগণের জানা দরকার।’ ৫ ও ৬ মার্চ
সকাল ৬টা হতে দুপুর ২টা পর্যন্ত হরতাল পালনের আহবান জানান। তিনি দেশের
জনগণের কথা ভেবে বলেন, ‘যে সব সরকারী ও বেসরকারি অফিসের কর্মচারীরা বেতন
পাননি, শুধু বেতন প্রদানের জন্য সেগুলো আড়াইটা হতে সাড়ে ৮টা পর্যন্ত খোলা
থাকবে। কেবল হাসপাতাল, এম্বুলেন্স, ডাক্তার, সাংবাদিক, পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস,
টেলিফোন, দমকল ইত্যাদি হরতালের আওতার বাইরে থাকবে।’
পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন আয়োজিত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের জনসভায় মতিয়া
চৌধুরী বলেন, ‘সাম্প্রদায়িক সপ্রীতি বজায় রাখতে হবে। বাংলার স্বাধীকারের
সংগ্রামকে ইপ্সিত লক্ষ্যে পৌছাতে হবে। আর এ জন্যই পাড়ায়-পাড়ায়, গ্রাম-গঞ্জে
সংগ্রাম কমিটি ও মুকিত্বাহিনী গড়ে তুলতে হবে। শ্রমিক কৃষক ছাত্র জনতাকে উদ্যোগ
গ্রহণ করতে হবে।’
বেতার, টেলিভিশন, চলচিত্র শিল্পীরাও আন্দোলনে একত্বতা জানান। রেডিও ও
টেলিভিশন হরতালের সমর্থনে জয় বাংলার বর্ন্দনীগীতি প্রচারিত করে। ফলে রেডিও
পাকিস্তান ‘ঢাকা বেতার কেন্দ্র’এ পরিনত হয়।
এই দিন ফরিদপুরে পূর্ণ হরতাল পালিত হয়। সর্ব সাধারণ এই হরতালের একাত্বতা
জানান। ফরিদপুরের প্রতিটি এলাকায় হরতালের সমর্থণে মিছিল বের হয়। ফরিদপুরে
স্মরণকালের ইতিহাসে বৃহত্তম প্রতিবাদ মিছিল বের হয়।
৪ঠা মার্চ রাজশাহীতে ৪ ঘন্টা সন্ধ্যা আইন বিরতি দিয়ে সকাল ১০টা থেকে পরের দিন
সকাল ৭টা পর্যন্ত পুনরায় জারি করে। সামরিক আইন প্রশাসনের সেনা দপ্তর থেকে
টেলিফোনে ভাইস চ্যান্সেলরকে বলা হয় ‘যে কোন ছাত্রকে রাস্তায় দেখা মাত্র গুলি
করার নির্দেশ রয়েছে।’ পাকিস্তানি সৈন্যরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন ছাত্রকে রাজশাহী
শহর থেকে গ্রফতার করে।
এই দিন খুলনা কারফিউ বহাল থাকে। কারফিউ উপেক্ষা করে প্রায় ২৫ হাজার ছাত্র-
জনতা আওয়ামী লীগের উদ্যোগে শহীদ হাদিস পার্কে একত্রিত হয়ে জনসভা করে।
খুলনায় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের মিছিলে পাকিস্তানি বাহিনী গুলি চালালে তিন জন
শহিদ হয়। ট্রেনের লাইন বিছিন্ন করতে খুলানায় রেল লাইনের পাটি তুলার সময়য়
পুলিশের গুলিতে চার জন শহিদ হয়। দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় খুলনা খুলনায় নিহত ৬
জন এবং হতাহত ৩৩ জনের কথা উল্লেখ করা হয়। যদিও এই দিন খুলনায় ৭ জন শহিদ
হয়।
চট্টগ্রামের পরিস্থিতি অনেকটা থমথমে ছিল, বাঙ্গালি-অবাঙ্গালি সংঘর্ষে কয়েকজন
হতাহত হন। এই দিন চট্টগ্রামে ১১৩ নং সামরিক আইন জারি করা হয়। দৈনিক
ইত্তেফাক পত্রিকায় বলা হয়, ‘বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী গতকাল (বুধবার)
ও আজকে (বৃহস্পতিবার) গোলাগুলী, অগ্নিসংযোগ ও সংঘার্ধে নিহতের সংখ্যা ১২১-এ
উন্নীত হয়েছে এবং আরে নিহত হওয়র আশঙ্কা করা হয়েছে। আজ রেলওয়ে গ্রাউন্ড
পাহাড়তলি ও আসবাগান এলাকায় সেগুনবাগিচায় আবার গুলীবর্ষণ কালে ৯ ব্যক্তি
নিহত হয়। এই রিপোট লেখার সময় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা
হয়। গতকাল চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যে সমস্ত আহত ব্যাক্তিকে
ভর্তি করা হয় তাদের মধ্যে ১৯ জন রাত্রি বেলায় মারা যায়। হাসপাতাল কতৃপক্ষ আজ
অপরাহ্ন পর্যন্ত ৬২ জনের মৃত্যুর সাটিফিকেট ইস্যু করা করেছে এবং এমন আরো
অনেক লাশ রয়েছে যেগ ুলো সাটিফিকেট ইস্যু করা হয় নাই।’
যশোরে মিছিলে পাকিস্তানি বাহিনী গুলি চালায়, তাদের গুলিতে চারুবালা ধর প্রথম শহিদ
হন। পরে ছাত্র-জনতা লাশের মিছিল বের করেন। ৩ মার্চে সামরিক বাহিনীর হাতে নিহত
হওয়া বিক্ষোভকারীদের স্মরণে বিভিন্ন জেলায় গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
বিভিন্ন স্থান থেকে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়।
